দেশের সবচেয়ে বর্ধনশীল খাত সরকারি ঋণ, প্রবৃদ্ধি ৩০%

দেশের জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) প্রবৃদ্ধির হার এখন সাড়ে ৪ শতাংশের ঘরে। আমদানি প্রবৃদ্ধির হারও ৩ দশমিক ৯১ শতাংশ। আর রফতানি প্রবৃদ্ধি গত আট মাস ধরে টানা নেতিবাচক।

ব্যাংক খাতে আমানত প্রবৃদ্ধির হারও ১০ শতাংশে সীমাবদ্ধ। সম্প্রসারণ নয়, বরং সংকোচনের মুখে রয়েছে কর্মসংস্থান সৃষ্টি। অর্থনীতির মৌলিক সূচকগুলোর নাজুক পরিস্থিতির মধ্যেও সরকারের ঋণ বাড়ছে তীব্র গতিতে। গত বছরের জানুয়ারির তুলনায় চলতি বছরের জানুয়ারিতে এক বছরের ব্যবধানে সরকারের ব্যাংক ঋণ প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। যদিও একই সময়ে দেশের বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ঘরে। অর্থাৎ গত এক বছরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির তুলনায় সরকারি ঋণ বেড়েছে পাঁচ গুণ। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি ১৫ শতাংশে সীমাবদ্ধ ছিল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি শেষে দেশের ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নেয়া ঋণের স্থিতি ছিল ৪ লাখ ৩৪ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা। চলতি বছরের জানুয়ারি শেষে তা ৫ লাখ ৬৩ হাজার ১৯৩ কোটি টাকায় ঠেকেছে। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে সরকারের ঋণ স্থিতি বেড়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার ৮৩২ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ।

দেশের ব্যাংক খাত থেকে সরকারের বাড়তি ঋণ নেয়ার প্রবণতা আরো তীব্র। সাধারণত প্রতি সপ্তাহের রোববার ট্রেজারি বিল ও মঙ্গলবার ট্রেজারি বন্ডের নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু অর্থ সংকটে থাকা সরকার আগামী ১ এপ্রিল বুধবারও ৯১ দিন মেয়াদি বিলের বিশেষ নিলাম ডেকেছে। ওই দিন বাজার থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এর আগে গত রোববারও (২৯ মার্চ) ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে সরকার ৮ হাজার ২৫০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল। এর মধ্যে ৯১ দিন মেয়াদি বিলের মাধ্যমে ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ঋণ নেয়া হয়েছে, যার সুদহার (কাট অফ ইল্ড) ছিল ৯ দশমিক ৭৮ শতাংশ। একই দিন ১৮২ দিন মেয়াদি বিলের মাধ্যমে ২ হাজার ৫০০ কোটি এবং ৩৬৪ দিন মেয়াদি বিলের মাধ্যমে ২ হাজার ২৫০ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে সরকার। এ দুটি বিলের সুদহার ছিল যথাক্রমে ৯ দশমিক ৯৭ ও ১০ শতাংশ। আর গতকাল ১৫ ও ২০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের মাধ্যমে ২ হাজার কোটি টাকার ঋণ নেয়া হয়েছে। এর আগে গত ২৪ মার্চ ইসলামী বিনিয়োগ বন্ডের মাধ্যমে সরকার ঋণ নিয়েছে ২ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা।

অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার ও উদ্যোক্তারা বলছেন, লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় সরকারের রাজস্ব আদায় প্রায় ৭২ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি। আর বিদেশ থেকে নতুন ঋণও আসছে না। এ অবস্থায় সরকার তার ব্যয় সংস্থানে অতিমাত্রায় ব্যাংক ঋণনির্ভর হয়ে পড়েছে। সরকারের ঋণের বোঝাও তাই এত দ্রুত বাড়ছে। রাজস্ব আদায় না বাড়লেও সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি ঋণ মওকুফসহ নতুন নতুন প্রকল্প নিচ্ছে। ব্যাংক কর্মকর্তারাও নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সরকারকে ঋণ দিতে বেশি উৎসাহী। এতে দেশের বেসরকারি খাত আরো বেশি ঋণবঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া বাজেটে নির্বাচিত সরকার কোনো পরিবর্তন আনেনি। ব্যয়ের ক্ষেত্রেও কোনো কাটছাঁট হয়নি। এ অবস্থায় সরকার সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় আরো বাড়িয়েছে। আবার নতুন প্রকল্পও নেয়া হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সারে সরকারের ভর্তুকি বাড়বে। এমনিতেই সরকার লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করতে পারছে না। উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকেও চলতি বাজেটের জন্য নতুন ঋণ সহায়তা সম্ভব নয়। তাহলে সরকারের কাছে সহজ বিকল্প হলো ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া। সরকার সে সহজ কাজটিই করছে।’

দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কয়েক বছর ধরেই কম উল্লেখ করে ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘এখন এ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ঘরে। দেশে নির্বাচনের মাধ্যমে একটি স্থিতিশীল সরকার এসেছে। কিন্তু বৈশ্বিক অবস্থা ও জ্বালানি সংকটের কারণে নতুন বিনিয়োগের পরিস্থিতি নেই। তার পরও খেয়াল রাখতে হবে, বেসরকারি খাত যাতে আর ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। কারণ আমাদের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের প্রধান ক্ষেত্র হলো বেসরকারি খাত।’

কয়েক বছর ধরেই দেশের অর্থনীতি নানা সংকটে ঘুরপাক খাচ্ছে। এর মধ্যে প্রধান সংকট হলো জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে স্থবিরতা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। বিপরীতে একই অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির গড় হার ছিল দুই অংকের ঘরে। সর্বশেষ ফেব্রুয়ারিতেও দেশে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের রফতানি প্রবৃদ্ধির হার নেতিবাচক। অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) রফতানি প্রবৃদ্ধি ছিল ঋণাত্মক ৩ দশমিক ১৫ শতাংশ। একই সময়ে আমদানি খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ শতাংশের নিচে। অর্থনীতিতে ইতিবাচক রয়েছে কেবল রেমিট্যান্স প্রবাহ। এখন পর্যন্ত এ খাতে প্রায় ১৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। অর্থাৎ সামষ্টিক অর্থনীতির সবক’টি সূচকের মধ্যে সরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধিই সবচেয়ে বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারি ঋণে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১৪ দশমিক ৯০ শতাংশ। আর গত বছরের জানুয়ারির তুলনায় চলতি বছরের জানুয়ারিতে এক বছরের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধির এ হার প্রায় দ্বিগুণ তথা ২৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ। একই সময়ে যেখানে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার মাত্র ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।

ব্যাংক খাতে প্রবৃদ্ধি হওয়া আমানতের বেশির ভাগ সরকারই নিয়ে যাচ্ছে বলে জানান বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘সরকার বাজেটে ঘোষিত লক্ষ্যের চেয়েও বেশি ঋণ ব্যাংক খাত থেকে নিচ্ছে। এ কারণে বেসরকারি খাত ঋণবঞ্চিত হচ্ছে। সরকারের চাহিদা বেশি হওয়ার কারণে ট্রেজারি বিল-বন্ডের সুদহার বেশি। এর প্রভাবে বেসরকারি খাতে ঋণের সুদহার বাড়ছে। ১৪-১৫ শতাংশ সুদ দিয়ে কোনো উদ্যোক্তার পক্ষে ব্যবসা করা সম্ভব নয়। বেসরকারি খাতে যে স্থবিরতা চলছে, এটি অব্যাহত থাকলে দেশের অর্থনীতি আরো বড় বিপদের মুখে পড়বে।’

অর্থ বিভাগের তথ্যানুসারে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট ঘাটতি মেটাতে ২ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকার ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত রয়েছে। এর মধ্যে স্থানীয় উৎস থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি ও বিদেশী উৎস থেকে ৯৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। তাছাড়া চলতি অর্থবছরে দেশী-বিদেশী মিলিয়ে ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার ঋণ পরিশোধের কথা রয়েছে। সরকারের ব্যয়ের তুলনায় রাজস্ব আহরণ কম হওয়ার কারণে বর্তমানে ঋণ করে পরিচালন ব্যয়ের কিছু অংশ মেটাতে হচ্ছে। তাছাড়া ঋণ শোধ করতেও ঋণ নিতে হচ্ছে।

সরকারের বছরভিত্তিক ঋণ পরিশোধ পরিকল্পনা অনুসারে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১ লাখ ৭৫ হাজার কোটি, ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছরে দেড় লাখ কোটি টাকারও বেশি ঋণ শোধ করতে হবে। এর সঙ্গে পরিশোধ করতে হবে ঋণের সুদও। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৩০ কোটি টাকার সুদ পরিশোধ করেছে সরকার। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি বর্তমান সরকারকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জে ফেলে দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আগামী দিনে ঋণের পরিমাণ বাড়লে সুদের পরিমাণও বাড়বে। সব মিলিয়ে ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধের পাশাপাশি পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয় মেটাতে চলতি অর্থবছরে সরকারের নেয়া ঋণের পরিমাণ ৩ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

সরকারি খাতে উচ্চ ঋণ প্রবৃদ্ধি হলেও সেটি উৎপাদনশীলতা তৈরি করে না বলে মনে করেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘বেসরকারি খাতে ঋণ গেলে সেটি নতুন পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে। কিন্তু সরকারি খাতে ঋণ গেলে সেটি কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে না। বর্তমানে সরকার যে ঋণ নিচ্ছে, সেটি দিয়ে পরিচালন ব্যয় নির্বাহ করছে। এখন ট্রেজারি বিলের সুদহার ১০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। এ বিলে বিনিয়োগ করে আমাদেরও তেমন কোনো মুনাফা হচ্ছে না। কারণ বেশির ভাগ ব্যাংক ১০ শতাংশের বেশি সুদে আমানত সংগ্রহ করছে।’

সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘সরকার খাল খননসহ বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি হাতে নিচ্ছে। আমি মনে করি, সরকারকে সবার আগে তার কাজের অগ্রাধিকার ঠিক করা দরকার। এ মুহূর্তে বাংলাদেশসহ বিশ্ব অর্থনীতি নাজুক পরিস্থিতিতে রয়েছে। সারা বিশ্বে জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করছে। এখনো দেশের মূল্যস্ফীতি অতি উচ্চ। এ পরিস্থিতিতে প্রতিটি কর্মসূচি সতর্কতার সঙ্গে নিতে হবে। অন্যথায় অর্থনীতি আরো নাজুক পরিস্থিতিতে পড়তে পারে।’

দেশী-বিদেশী উৎস থেকে গত ডিসেম্বর শেষে সরকারের মোট ঋণ স্থিতি ছিল প্রায় সাড়ে ২৩ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেয়। বিপুল ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়ে নতুন সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এর আগে বণিক বার্তাকে বলেছিলেন, ‘উত্তরাধিকার সূত্রে আমরা যে অর্থনীতি পেয়েছি তার সব সূচকই নিম্নমুখী। আমাদের ঘাড়ে বিপুল ঋণের বোঝা এসে পড়েছে। শুরু থেকে তাই অর্থ সাশ্রয়ের উদ্যোগ নিয়েছি। কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। কর ফাঁকি ও দুর্নীতি রোধ করে অর্থ সাশ্রয়ের চেষ্টা করছি। যেসব প্রকল্প নেয়া হচ্ছে সেগুলো ব্যয়ের দিক থেকে লাভজনক কিনা, রিটার্ন আসবে কিনা, কর্মসংস্থান তৈরি করবে কিনা সেগুলো বিবেচনা করা হচ্ছে। আমাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নিজস্ব বাজেটের পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের সব কার্যক্রমকে এখন আমাদের ইশতাহারের কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করে পরিচালনা করতে হচ্ছে। এসব কিছু নিয়েই আমরা এগোচ্ছি।’

আরও